টিন (টিআইএন) থাকলেই কি আয়কর রিটার্ন দিতে হবে? জিরো রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম ও রিটার্ন না দেওয়ার পরিণতি
বাংলাদেশে টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট নেওয়ার পর অনেকেই মনে করেন, আয় না থাকলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাঁদের আয় না থাকলেও বা প্রদেয় কর শূন্য হলেও রিটার্ন জমা দিতে হতে পারে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬ অনুযায়ী, নির্ধারিত ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। তাই শুধু আয় নেই বলে রিটার্ন দেওয়া থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। তবে আইনে নির্ধারিত ব্যতিক্রম ও অব্যাহতির বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।

জিরো রিটার্ন কী?
জিরো রিটার্ন বলতে সাধারণত এমন আয়কর রিটার্নকে বোঝায়, যেখানে হিসাব অনুযায়ী প্রদেয় আয়করের পরিমাণ শূন্য।
কোনো ব্যক্তির আয় না থাকলে অথবা তাঁর আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমার মধ্যে থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। তবে জিরো রিটার্ন মানে রিটার্নের প্রতিটি ঘরে শূন্য লেখা নয়। প্রকৃত আয়, সম্পদ, দায় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হয়।
অনলাইনে জিরো রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম
ঘরে বসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা যায়।
ওয়েবসাইট: https://etaxnbr.gov.bd/
রিটার্ন জমা দেওয়ার ধাপগুলো হলো:
১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন।
২. আগে অ্যাকাউন্ট থাকলে লগইন করুন। নতুন ব্যবহারকারী হলে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করুন।
৩. রিটার্ন দাখিলের অপশন নির্বাচন করে ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রযোজ্য করবর্ষের বিবরণ যাচাই করুন।
৪. বেতন, ব্যবসা, বাড়িভাড়া, ব্যাংক সুদ বা অন্যান্য উৎস থেকে আয় থাকলে সঠিক তথ্য দিন।
৫. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যালেন্স, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণ ও ব্যক্তিগত ব্যয়ের বিবরণ পূরণ করুন।
৬. করের হিসাব যাচাই করুন। হিসাব অনুযায়ী প্রদেয় কর শূন্য হলে তা রিটার্নে প্রতিফলিত হবে।
৭. সব তথ্য ভালোভাবে পরীক্ষা করে রিটার্ন সাবমিট করুন এবং প্রাপ্তিস্বীকার বা Acknowledgement Slip ডাউনলোড করে রাখুন।
মনে রাখবেন, আয় নেই বলে সম্পদ বা অন্যান্য তথ্য গোপন করা কিংবা সব ঘরে শূন্য লেখা সঠিক পদ্ধতি নয়।
রিটার্ন জমা দিতে কী কী প্রয়োজন?
সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে:
• টিআইএন সার্টিফিকেট ও টিআইএন নম্বর
• জাতীয় পরিচয়পত্র
• নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী
• বেতন বা অন্যান্য আয়ের হিসাব
• ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের তথ্য
• সম্পদ ও দায়ের বিবরণ
• ব্যক্তিগত ব্যয়ের হিসাব
প্রত্যেক করদাতার ক্ষেত্রে সব নথি একইভাবে প্রয়োজন হয় না। নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী তথ্য প্রস্তুত রাখুন।
আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে কী সমস্যা হতে পারে?
যাঁদের জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাঁরা নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে কয়েক ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন।
১. জরিমানা হতে পারে
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬ অনুযায়ী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। জরিমানার পরিমাণ ও সীমা সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান এবং করদাতার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
২. বকেয়া করের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না
প্রকৃতপক্ষে কর প্রদেয় থাকলে রিটার্ন জমা না দিলেও সেই করের দায় শেষ হয় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বকেয়া কর ও অন্যান্য আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে।
৩. নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণে সমস্যা হতে পারে
কিছু সরকারি, আর্থিক ও ব্যবসায়িক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রিটার্নের প্রমাণ না থাকলে সংশ্লিষ্ট সেবা পেতে জটিলতা হতে পারে।
৪. কর কর্তৃপক্ষের নোটিশ বা আইনি কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে পারেন
আইন অনুযায়ী রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তা জমা না দিলে কর কর্তৃপক্ষ প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ায় নোটিশ বা অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।
৫. ভবিষ্যতে করসংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে
দীর্ঘদিন রিটার্ন জমা না দিলে আয়, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের হিসাব মেলাতে সমস্যা হতে পারে। তাই রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলে সময়মতো দাখিল করাই ভালো।
টিআইএন আছে, কিন্তু আয় নেই। তাহলে কী করবেন?
প্রথমে নিশ্চিত হোন, আপনার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না। বাধ্যতামূলক হলে প্রকৃত তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দিন। প্রদেয় কর শূন্য হলেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে তা উপেক্ষা করবেন না।
আর যদি মনে করেন আপনার আর টিআইএন প্রয়োজন নেই, তাহলে আইন অনুযায়ী টিআইএন নিবন্ধন বাতিল বা সংশ্লিষ্ট অব্যাহতির যোগ্যতা আছে কি না, তা যাচাই করুন। শুধু আয় নেই বলে নিজের সিদ্ধান্তে রিটার্ন দেওয়া বন্ধ করবেন না।
শেষ কথা
টিআইএন নেওয়ার পর রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। আপনার আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই নিজের পরিস্থিতি যাচাই করুন, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখুন এবং প্রযোজ্য সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করুন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরকারি ওয়েবসাইট: https://nbr.gov.bd/
ই-রিটার্ন পোর্টাল: https://etaxnbr.gov.bd/
পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদেরও সচেতন করুন।


