সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ২২, ২০১৭ তারিখে ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ
আজ : ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পাইরাসি এবং সফটওয়্যারের স্বাধীনতা

admin | সেপ্টেম্বর ১৬, ২০০৭, ৪:০৭ অপরাহ্ণ
Domain

আমরা যারা কম্পিউটার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্য ব্যবহার করি তারা সবাই সফটওয়্যার নামক শব্দের সাথে পরিচিত। সফটওয়্যারই হচ্ছে এসকল যন্ত্রের চালক শক্তি। আর সফটওয়্যারের জন্যই ১৫ সেপ্টেম্বর ‘সফটওয়্যার স্বাধীনতা দিবস’। আমরা কজনেই বা জানি এই দিবসটির কথা।
সফটওয়্যারের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই পাইরেসির কথা বলতে হয়। কারণ ব্যবহারকারীরা চাই তাদের ইচ্ছামত সফটওয়্যার ব্যবহার করতে আর সফটওয়্যার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান পাইরেসির অজুহাতে কপিরাইট আইনকে অধিক কার্যকর করতে চাই। সত্যি কথা হচ্ছে আমরা যেসকল সফটওয়্যার ব্যবহার করি তার বেশীর ভাগই পাইরেসি, ফ্রি অথবা ফ্রিওয়্যার। এছাড়াও ইন্টারনেট থেকে ডেমো বা ট্রাইল ভার্সনও আমরা ব্যবহার করে থাকি। আমাদের দেশে কিছু কিছু বড় বড় প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার কিনে বা লাইসেন্স করে ব্যবহার করে তাছাড়াও অপারেটিং সিস্টেমসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল সফটওয়্যারই বাকী পদ্ধতিতে পাওয়া। এসব নিয়েই আজকের আলোচনা।
পাইরেসি: সফটওয়্যার পাইরেসির ক্ষেত্রে নির্মাতারা তাদের আর্থিক ক্ষতির কথাটাই সবসময়ে বলে আসছে। তবে ব্যবহারকারীরা পাইরেসিকে বড় ধরনের অপরাধ হিসাবে মানতে নারাজ। সফটওয়্যার নির্মাতারা সফটওয়্যার পাইরেসি বন্ধে এযাবৎ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশে আইনও আছে। তারা সফটওয়্যার পাইরেসিকে কোন (জড়বস্তুর) চুরির সাথে তুলনা করেছে যেটা ভুল। কারণ সফটওয়্যার কেউ পাইরেসি করলে প্রকৃত ব্যবহারকারী বা নির্মাণকারীর কোন ক্ষতি হচ্ছে না। বরং যে কপি করে ব্যবহার করছে সে লাভবান হচ্ছে। সবার আগে ভেবে দেখা দরকার সফটওয়্যার পাইরেসি হলে কে লাভবান হচ্ছে আর কে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নির্মাতারা (যদি) মনে করে যারা সফটওয়্যার পাইরেসি করে ব্যবহার করছে তারা সবাই তার সফটওয়্যারের ক্রেতা তাহলে তারা ভুল বলছে বা ভুল বোঝাচ্ছে। বাস্তবে দেখা যায় আপনার কেনা/তৈরীকৃত একটি কলম যদি অন্যকেউ ব্যবহার করি তাহলে সেটি আপনি ব্যবহার করতে পারছেন না বা অন্যের ব্যবহারের ফলে কলমটি একসময় ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে যাবে। ফলে উক্ত ব্যাক্তি আপনার কলম চুরি করে বা না বলে নিয়ে ব্যবহার করে আপনার ক্ষতি করছে যা সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ একটি সফটওয়্যার কপি করে লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যবহার করতে পারে যা জড়বস্তুর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। আপনার তৈরীকৃত কোন সফটওয়্যার যদি আমি কপি (পাইরেসি) করে ব্যবহার করি তাহলে আপনার আর্থিক বা সফটওয়্যারের গুণগত কোন ক্ষতি হচ্ছে না বরং আপনার সফটওয়্যারের ভুলত্রুটি আমি আপনাকে ধরিয়ে দিতে পারছি। এতে পরোক্ষভাবে আপনিই (সফটওয়্যার নির্মাতায়) লাভবান হচ্ছেন। আরেকটি উদাহারণ হলো মাইক্রোসফট উইন্ডোজ এবং অফিস। আমরা বাংলাদেশীরা যারা কম্পিউটার ব্যবহার করি তারা কজন উইন্ডোজ এবং অফিস কিনে ব্যবহার করি? বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও উইন্ডোজ এবং অফিস পাইরেসি ব্যবহৃত হয়। যাই হোক পাইরেসি করে ব্যবহারের ফলেই আজ উইন্ডোজ এবং অফিসের জনপ্রিয়তা এত বেশী। উইন্ডোজ এবং অফিস যদি সবাইকে কিনে ব্যবহার করতে হতো তহলে হয়তো অল্পকিছু মানুষ তা কিনে ব্যবহার করতো বা কিনতে পারতো ফলে বাকী কম্পিউটার ব্যবহাকারীরা উইন্ডোজ এবং অফিসের বিকল্প ব্যবহার করতে বাধ্য হতো। এখন ভেবে দেখুন উইন্ডোজ এবং অফিস পাইরেসি করে ব্যবহার করার ফলে ব্যবহারকারীর চাইতে মাইক্রোসফটই বেশী লাভবান হচ্ছে।
সফটওয়্যারের মালিকানা: মালিকানার ক্ষেত্রে কপিরাইট শব্দের একটা সম্পর্ক আছে। কপিরাইট ব্যবস্থাটি মূলত মুদ্রণ ব্যবসা থেকে এসেছে। কোন পুস্তক প্রকাশক ব্যবসায়ের জন্য পুস্তক প্রকাশ করে কিন্তু অন্য কেউ না অনুমতি ব্যতীত প্রকাশ করে বিক্রি করলে প্রকাশক আর্থিক ক্ষতি সম্মুখীন হবেন। অতএব বোঝা যাচ্ছে কপিরাইট আইন মূলত অনান্য প্রকাশকদের জন্য পাঠকদের জন্য নয়। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কপিরাইট ব্যবস্থা সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। একটি সফটওয়্যার তৈরীতে বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহৃত হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রোগ্রামার কাজ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব সফটওয়্যারের আসল মালিক কে? প্রোগ্রামার নাকি সংশ্ল্লিষ্ট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রোগ্রামাররা চাকুরী করে। বাস্তবে দেখা যায় আমরা যেসকল সফটওয়্যার ব্যবহার করি তাদের পিছনের মূল কারিগর অর্থাৎ প্রোগ্রামারদের আমরা চিনি না আর ঐ বিক্রিত সফটওয়্যারের কপিরাইট দাবী করে বিক্রিয়কারী প্রতিষ্ঠানটি। যেহেতু প্রোগামাররা সফটওয়্যার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা সুতারাং তারা সফটওয়্যারের মালিক দাবী করতে পারে না। এমতবস্থায় সফটওয়্যারটি যদি আমি ব্যবহারের জন্য ক্রয় করি তাহলে সফটওয়্যারের মালিক আমি কেন নয়? যেহেতু সফটওয়্যারটি আমি অর্থ খরচ করে ক্রয় করেছি, সেহেতু সফটওয়্যারের কপিরাইট আমার হওয়া উচিৎ। আর সফটওয়্যারের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান একই সফটওয়্যার বিভিন্ন জনের কাছে লাইসেন্স প্রদান করে। আর লাইসেন্সের মাধ্যমে সফটওয়্যার নিয়ে তা অনুমতি ব্যতিত কপি করাকে পাইরেসি নামে অখ্যায়িত করে রেখেছে। অর্থাৎ কপিরাইটে ছড়ি ব্যবহারকারীদের উপরে ঘোরানো হচ্ছে। সফটওয়্যার বিক্রি বা লাইসেন্স প্রদান করে গ্রাহকদের হয়রানি করার উদাহারণও আছে প্রচুর। একটা উদাহারণ দিলে সহজে বোঝা যাবে, একটি ব্যাংক বড় ধরণের অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকিং সফটওয়্যার কিনে ব্যবহার করছে, যা দেখ-ভালের দায়িক্তও উক্ত সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিন্তু জানেনা সফটওয়্যারের অভ্যন্তরে কি হচ্ছে বা কিভাবে হচ্ছে বা কি কি ত্রুটি আছে। ফলে তথ্য চুরি হলে বা ভবিষ্যতে সফটওয়্যার বিক্রিয়কারী প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকমেইল করলে উক্ত ব্যংকের কিছুই করার থাকে না। এমতবস্থায় উম্মুক্ত সফটওয়্যারে এধরনের সুযোগ নেই। কারণ উম্মুক্ত সফটওয়্যারে ব্যবহারকারী জানে সফটওয়্যারের নাড়ি নক্ষত্র, এখানে সফটওয়্যার কোম্পনীর কর্তৃত্ব কম থাকে। এর ফলে উম্মুক্ত সফটওয়্যার দিনে দিনে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এজন্য উম্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে পদক্ষেপ দেওয়া উচিৎ।
উম্মুক্ত (ওপেন সোর্স) সফটওয়্যার: বর্তমানে উম্মুক্ত সফটওয়্যারের কথা বেশ জোড়ে সোরে শোনা যায়। উম্মুক্ত সফটওয়্যারের ফলে সফটওয়্যারের ব্যবহারকারীরা বেশী উপকৃত হবে। উম্মুক্ত সফটওয়্যারের সবচেয়ে বড় উদাহারণ হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স। এছাড়াও জনপ্রিয় উম্মুক্ত সফটওয়্যারগুলো হচ্ছে ওপেন অফিস (এমএস অফিসের সমতুল্য), মজিলা ফায়ারফক্স (ওয়েব ব্রাউজার) ইত্যাদি। উম্মুক্ত সফটওয়্যারের ব্যবহারের ফলে ব্যবহারকারীরা অর্থিক দিক থেকে বেশী লাভবান হবে।
ফ্রি সফটওয়্যার: ফ্রি সফটওয়্যারের মূল উদ্দেশ্য হলো সফটওয়্যার ব্যবহারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিনামূল্যে/ফ্রিতে বিতরণ নয়। ফ্রি সফটওয়্যার যে সবসময়ই বিনামূল্যে/ফ্রিতে পাওয়া যাবে এমনটি নয়। ফ্রি সফটওয়্যাররের মূল বিষয় হলো ইচ্ছামত সবই করা যায়। ক্রয় করে বা বিনামূল্যে ডাউনলোড করে পাওয়ার পরে স্বাধীনভাবে সফটওয়্যারটির কপি, বিতরণ বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারবেন এমনকি সফটওয়্যারের কোন অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা উন্নতি (কম্পাইলার বা ডিকম্পাইলার) করা যাবে। আর ফ্রিওয়্যার হচ্ছে সেসকল সফটওয়্যার যেগুলো বিনামূল্যে অনলাইন বা অন্য কোন যায়গা থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু এই সফটওয়্যার তৈরীকৃত কোম্পানীর কপিরাইটের অধিকৃত থাকে। কপিরাইট আইন অনুযায়ী এই সফটওয়্যার কেউ বিক্রি বা পরিবর্তন করতে পারবে না। ফ্রিওয়্যার সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে অভ্র (বাংলা উইনিকোড কীবোর্ড), অপেরা (ব্রাউজার), ডাউনলোড এক্সেলেটর (ডাউনলোড ম্যানেজার) ও রবো ফরম (ব্রউজার টুলস) অন্যতম এবং ফ্রি সফটওয়্যার গুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে লিনাক্স এছাড়াও বিজয় এক্সপি (বাংলা লেখার বিজয় কীবোর্ড), মজিলা ফায়ারফক্স (ওয়েব ব্রাউজার), লাইমওয়্যার (ফাইলশেয়ারিং) উল্লেখ্যযোগ্য। বর্তমানে উম্মুক্ত সফটওয়্যার এবং ফ্রি সফটওয়্যারের মধ্যে পার্থক্যটুকু সামান্য। ফলে অনেকেই উম্মুক্ত সফটওয়্যারকে ফ্রি সফটওয়্যার মনে করে।
সফটওয়্যারের কপিরাইটহীন বা মালিকানাহীন হলে ব্যবহারকরীরা আরো সহজে সফটওয়্যারের সুবিধা পাবে। এমনটি যেহেতু হওয়া সম্ভব হবে না সেহেতু আমারদে সকলকে উম্মুক্ত সফটওয়্যারের দিকে বেশী ঝুঁকতে হবে। সফটওয়্যারের স্বাধীনতা দিবসে উম্মুক্ত সফটওয়্যারের জয়ধ্বনিই আশা করি।

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন